ফেনী
বুধবার, ২০শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৭:৫১
, ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

নুসরাতের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা,বিচারের অভিজ্ঞতা ও একজন বিচারকের সদিচ্ছা

আজ ১০ই এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার আলিম ২য় বর্ষের ছাত্রী (আলিম পরীক্ষার্থী) নুসরাত জাহান রাফির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ইং সালের এই দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় নুসরাত রাত ৯.৩০ ঘটিকার সময় মৃত্যুবরন করেন। নুসরাতের ১ম মৃত্যুবাষিকীতে তাকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরন করি। মহান আল্লাহর নিকট তার আত্বার মাগফিরাত কামনা করি তার শোক সম্ভপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করি। একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে তার পিতা/মাতা ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা বর্তমানেও দিশেহারা। ২০১৯ সালে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ও নৃশংস হত্যকান্ড এটি। সারা দেশের মানুষের ন্যায় আমাকেও ভীষনভাবে কষ্ট দিয়েছিলো এই হত্যাকান্ড। সমগ্র বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র/ছাত্রীরা রাস্তায় নেমেছিলো আলোচিত এই হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে। অনেকে ধারনা করেছিলো বাংলাদেশের আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর রুনি, কুমিল্লার তনু হত্যাকান্ডসহ অন্য অনেক হত্যাকান্ডের মত এটিও ধামা চাপা পড়ে যাবে। প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়বে না। ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে আসামীরা বেরিয়ে পড়বে, প্রভাবশালী আসামীদের কারনে অসহায় এ পরিবারটি বিচার পাবে না। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী ও মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক তত্ত্বাবধানে এর কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচার নিস্পত্তি হয়। সকল ভয়কে জয় করে নুসরাতের পরিবার বিনা খরচে বিচার পেয়েছে। খুনীরা শাস্তি পেয়েছে, কোন অপরাধী বাঁচতে পারে নাই।

আপনারা জানলে আরও খুশী হবেন যে, ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্টে) মামলাটি দ্রুত নিস্পত্তির জন্য মামলার পেপারবুক তৈরী করা হয়েছে এবং সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকার ও মাননীয় বিচারপতি হাসান ইমাম মহোদয়ের নেতৃত্বে ১ টি বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। দেশে করোনা পরিস্থিতির কারনে সাধারন ছুটি না থাকলে মামলাটি এতদিনে হাইকোর্ট বিভাগে শুনানী আরাম্ভ হয়ে যেত। এই মামলার বিচারিক কাজে বাদী পক্ষের (নুসরাতের) আইনজীবি হিসাবে কাজ করে জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। আপনারা জানেন যে, মামলার তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ (পি.বি.আই) এই মামলার তদন্ত কালে বাদী, ডাক্তার, জেলার, শিক্ষক, পরীক্ষকসহ মোট ৯২ জন কে স্বাক্ষী হিসাবে মান্য করেছিলো। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফেনীর মাননীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জনাব মামুনুর রশিদ মোট ৮৭ জন স্বাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা লিপিবদ্ধ করেন। এই মামলাটি নারী ও শিশু আদালতে বিচারের জন্য প্রেরন করা হলে মাননীয় আদালত প্রতি কর্ম দিবসে এই মামলার তারিখ রেখেছিলেন। আপনারা জানেন, গত বছর ২৭শে মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজদৌল্লা তার পিয়ন নুরুল আমিনের মাধ্যমে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে তার অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে প্রথমে যৌন হয়রানী করেন। এই ঘটনায় ঐ দিনই নুসরাতের মা শিরিন আক্তার অধ্যক্ষ সিরাজকে আসামী করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করে, জি.আর: ৪৭/১৯ইং, যাহার থানার মামলা নং- ২৪, তারিখ ২৭/০৩/২০১৯ইং, ধারা: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ১০ ধারা। যাহা পরবর্তীতে নারী শিশু ২৩৫/১৯ইং মামলায় রুপান্তর হয়ে বর্তমানে আদালতে এখনও বিচারাধীন আছে। উক্ত মামলার ভিকটিম হিসাবে নুসরাত বিগত ২৮/০৩/২০১৯ইং তারিখে ফেনীর আদালতে এসে তৎকালীন সোনাগাজী আমলী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব এ.এস.এম এমরান সাহেবের কাছে ২২ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন। এই মামলায় সিরাজ গ্রেফতার হওয়ায় সিরাজের অনুগত বাহিনী সিরাজের মুক্তির দাবীতে ফেনী ও সোনাগাজীতে একের পর এক মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে মুক্তি দাবী করতে থাকেন। এখানে ১ টি বিষয় উল্লেখ করা দরকার লম্পট সিরাজ আগ থেকে চরিত্রহীন ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গকারী এবং অর্থ আত্বসাৎকারী প্রকৃতির লোক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে পূর্ব থেকে প্রতারনা, অর্থ আত্বসাৎ ও ২০১৪, ১৫,১৬ সালে দেশে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে ফেনীর আদালতে বহু মামলা বিচারাধীন আছে।
যার ফলে অধ্যক্ষ সিরাজকে আগ থেকেই ফেনীর অনেক আইনজীবি চিনতেন। সিরাজের মুক্তি আন্দোলনের নেতাদেকে পরামর্শ দেয়া হলো যে, নুসরাত ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছে তাহা প্রত্যাহার করাতে পারলেই সিরাজ জামিন পেয়ে যাবেন। সিরাজ মুক্তি পেলেই মুক্তি আন্দোলনের নেতারা রাতারাতি বড় লোক হবেন, মাদ্রাসার বড় মার্কেটের দোকানগুলো দখল নিবেন, আলীম ফাইনাল পরীক্ষার ফি আদায়সহ, মাদ্রাসার পুকুরের বড় বড় মাছ নিতে এবং মাদ্রাসার তহবিলে থাকা মাহফিলসহ বিভিন্ন খাতের
আয়কৃত লাখ লাখ টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নিতে পারবেন। ফ্রি স্টাইলে আলিম পরীক্ষা দিয়ে সবাই পাশ করতে পারেবেন। এরই আশায় বিগত ০৬/০৪/২০১৯ইং তারিখ সকাল ০৯.৩০ ঘটিকায় আরবী ১ম পত্র পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নুসরাত যখন পরীক্ষা কেন্দ্রে যান, তখন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অধ্যক্ষ সিরাজের ভায়রার মেয়ে উম্মে সুলতানা পপি নুসরাত কে মাদ্রাসার মাঠ থেকে চাঁদে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে সিরাজ বাহিনীর অপর সদস্য শাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, যোবায়ের, শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতের দেওয়া ২২ ধারার জবানবন্দী প্রত্যাহার করার জন্য প্রথমে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য নুসরাতকে চাপ সৃষ্টি করেতে থাকেন, নুসরাত রাজি না হলে খুনিরা নুসরাতকে ধাক্কা দিয়ে চাঁদের ফ্লোরে ফেলে দেয়। নুসরাতের গায়ের ওড়না চিড়ে ২ ভাগ করে তা দিয়ে খুনিরা তার হাত ও পা বেধে ফেলে। আসামী শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতের মুখ ও মাথা ছাপ দিয়ে ধরে রাখে, পপি ও জোবায়েরসহ অপরাপর আসামীরা নুসরাতের হাত ও পা চেপে ধরে রাখে, জাবেদ ছাদের বাথরুমের পাশে থাকা কালো পলিথিনে রক্ষিত কেরোসিন তৈল ১টি কাঁচের গ্লাসে করে নুসরাতের গায়ে ঢেলে দেয় অতঃপর আসামী জোবায়ের তার তার কাছে থাকা ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে তা নুসরাতের গায়ে চুড়ে মারলে মুহুর্তের মধ্যে নুসরাতের সমস্ত শরীরআগুনে দগ্ধ হয়ে যায়। আগুনে নুসরাতের হাত ও পাঁয়ের বাধন পুড়ে যাওয়ার পর নুসরাত অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় চিৎকার করে বাঁচার জন্য দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে ২য় তলায় আসলে পরীক্ষা কেন্দ্রে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য রাসেল পাপোষ দিয়ে নুসরাতকে জড়িয়ে ধরে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে এবং অন্যান্য লোকজনের সহায়তায় প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা হাসপাতালে পরে ফেনী সদর হাসপাতালে এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় নুসরাত মারা যায়। নুসরাতের বড় ভাই নোমান বিগত ০৮/০৪/২০২৯ইং তারিখে ০৮ জনকে আসামী করে সোনাগাজী থানায় জি.আর: ৫৯/১৯ইং (২য় মামলা) মামলা দায়ের করেন। সরকারী আদেশে মামলাটি বিগত ১০/০৪/১৯ইং তারিখে পি.বি.আইতে তদন্তের জন্য প্রেরন করা হলে, পি.বি.আই. কর্তৃপক্ষ সকল আসামীদের গ্রেফতার করে মাত্র ১ মাস ১৯ দিনের মাথায় ১৬ জন আসামীকে অভিযুক্ত করে বিগত ২৯/০৫/২০১৯ইং তারিখে বিজ্ঞ আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। মামলাটি বিগত ৩০/০৫/২০১৯ইং তারিখে নারী ও শিশু আদালতে বিচারের জন্য বদলী হয়ে আসে। পরবর্তীতে মামলাটি নারী ও শিশু ১৮১/১৯ই মামলা হিসাবে বিজ্ঞ আদালতে নিস্পত্তি হয়। ৩০/০৫/২০১৯ইং তারিখ থেকে ২৪/১০/২০১৯ইং পর্যন্ত মোট ৪ মাস ২৫ দিনের মাথায় মাননীয় আদালত অভিযুক্ত ১৬ (ষোল) আসামীর সকলকে ফাঁসীর দন্ডে দন্ডিত করেন।
এখানে ১টি কথা না বললে নয় যে, পি.বি.আই মাত্র ৫৫
কার্য দিবসে চার্জসীট দাখিল করে। মামলাটি পি.বি.আই প্রধান ডি.আই.জি বনোজ কুমার মজুমদার নিজেই সার্বক্ষনিক মনিটর করেছেন। নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের বিচারক জনাব মামুনুর রশিদ মাত্র ৬২ কর্ম দিবসে মামলার রায় ঘোষনা করেন। বাংলাদেশের আইন শৃংখলা বাহিনী ইচ্ছা করলে যে কোন অপরাধী সনাক্ত করন, অপরাধের রহস্য উৎঘাটন, অপরাধীকে বিচারের জন্য আদালতে সোর্পদকরন, একদম সহজ কাজ, এই মামলাটি তার উদাহরন। আর দেশের সকল আদালতের বিচারকগন যদি মনে করেন, একজন বিচারক আল্লাহর প্রতিনিধি। চাকুরীর জন্য নয় অপরাধীদেরকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য এবং দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য উনারা কাজ করবেন, তাহলে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলাগুলো নিস্পত্তি করা সম্ভব এই মামলাটি তার জলন্ত উদাহরন। আমাদের দেশে অনেকেই শুধু সরকারের চাকুরী করেন, বেতন ভাতা নেন, চাকুরী টিকানোর জন্য যা যা করার দরকার তাহাই করেন। কিন্তু আমরা আইনজীবীগন, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ, বিজ্ঞ বিচারকগন সহ সকলেই যদি যার যার জায়গায় থেকে উঠে এসে সকল মামলায় সঠিক দায়িত্ব পালন করি তবেই দেশের আইনের শাসন কায়েম হবে ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে এবং অপরাধীরা শাস্তি পাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে justice delayed justice denied.
করোনোর এই মহামারী থেকে আল্লাহ আমাদের সকল কে রক্ষা করুন। আর আমরা সবাই সরকারী নির্দেশনা মোতাবেক ঘরে থাকুন। এই কামনা করে সব শেষে কবির ভাষায় বলতে চাই
ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ভয় পেওনা তোমরা,
আল্লাহ আছেন উপরে,
অন্যায় অবিচার পালিয়ে যাবে,
আমরা তোমরা সকলেই উঠে দাঁড়ালে
আল্লাহ হাফেজ।
লিখক

এড: এম শাহজাহান সাজু
সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ
এন্ড জাজেস কোর্ট, ফেনী

ট্যাগ :

আরও পড়ুন


Logo