ফেনী
বুধবার, ১২ই মে, ২০২১ ইং, রাত ২:৫৩
, ২৮শে রমজান, ১৪৪২ হিজরী

দেদারসে আসছে ইয়াবার চালান

করোনা পরিস্থিতি যাই হোক, দেশের সব খাত এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তাই পিছিয়ে নেই মাদকচক্র তথা ইয়াবা কারবারিরাও। পাশর্^বর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে বর্তমানে দেদারসে আসছে মরণনেশা ইয়াবার বড় বড় চালান। সীমান্ত ভাগ করা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে ইয়াবার চালান কয়েক ধাপের নজরদারি এড়িয়ে টেকনাফ হয়ে সরবরাহ হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে।
মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইয়াবার অধিকাংশ চালানই আসছে মিয়ানমার থেকে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সীমান্তবর্তী নাফ নদী পার করে দেশি-বিদেশি (মিয়ানমার) চক্র ইয়াবার চালান আনছে। ইয়াবা বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশিক্ষিত রোহিঙ্গা সাঁতারুদের। কক্সবাজারের স্থানীয় কিছু মাদককারবারি ও মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা মিলেমিশেই মূলত এসব ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদকের চিহ্নিত রুট একদিকে বন্ধ করলে আরেকদিকে তারা চালু করছে। পাশাপাশি ইয়াবা পাচারে চক্রগুলো প্রতিনিয়তই প্রয়োগ করছে নিত্যনতুন কৌশল।
মেরিন ড্রাইভে পুলিশের চেকপোস্টে গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ নিহত হওয়ার পর কক্সবাজার-টেকনাফে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করলেও তার মধ্যেই ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে মাদকচক্র। যদিও গত দেড় মাসে ইয়াবার বেশকিছু বড় চালান আটকও হয়েছে, যার সিংহভাগ সাফল্যই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের অভিযানে। এর বাইরেও এলিট ফোর্স র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) অভিযানেও বেশকিছু ইয়াবা চালান আটক হতে দেখা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন্স ও গোয়েন্দা) ডিআইজি ড. এএফএম মাসুম রব্বানী  জানান, মাদক তৎপরতা করোনার কারণে গত এপ্রিল ও মে মাসে অনেকাংশেই কম ছিল। অনেক স্পটই তখন বন্ধ ছিল। জুলাই থেকে তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে। সবকিছু যখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে তখন মাদকচক্রও সক্রিয় হয়ে উঠছে। এ কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পাশাপাশি অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইয়াবাসহ নানা মাদকদ্রব্য আটক হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে মাদক কারবারিদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় আরও বেশি জোরদার অভিযান শুরু করা হয়েছে।
গত দেড় মাসের বড় কিছু অভিযান পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ থেকে ১৮ হাজারেরও বেশি ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়ন। তার আগের দিন গত ১৩ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ শহিদুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান নামে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তার আগে গত ১১ আগস্ট রাতে টেকনাফের খারাংখালী এলাকা দিয়ে মিয়ানমার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
এ সময় দুই মাদক কারবারি বিজিবির টহল দেখে ইয়াবা ও নৌকা ফেলে সাঁতরে নদী পেরিয়ে শূন্যরেখা অতিক্রম করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলে যায়। তার আগের রাতে গত ১০ আগস্ট টেকনাফের হ্নীলার নোয়াপাড়া জেলেঘাটা বাজার থেকে ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। মোটরসাইকেলে ওই ইয়াবা পাচার করা হচ্ছিল। এ সময় বিজিবির চেকপোস্ট দেখে দূর থেকেই ইয়াবার ব্যাগটি ফেলে পালিয়ে যায় মাদকচক্রের ওই সদস্য। গত ৫ আগস্ট রাতে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) একটি দল লেদা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ রঙ্গিখালীর লেদাখাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ সময় গ্রেফতার করা হয় আরাফাত নামে এক মাদক কারবারিকে। গত ২৯ জুলাই কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) একটি দল অভিযান চালিয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তিন নম্বর ঘুমধুম ইউপির দক্ষিণ রেজুআমতলীতে পাহাড়ি এলাকা থেকে ৮০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। গত ২৮ জুলাই টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নোয়াপাড়ায় নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশকালে ১ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবার আরও একটি বড় চালান আটক করে বিজিবি। এ সময় দুজন ইয়াবা কারবারি নাফ নদী সাঁতরে পালিয়ে যেতেও সক্ষম হয়। গত ২৪ জুলাই টেকনাফের মোচনী লবণ মাঠের পাশে ছুরিখাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবার একটি বড় চালান আটক করে বিজিবি।
স্থানীয় বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, মিয়ানমার থেকে চালানটি বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছিল। অভিযানকালে গুলিতে দুজন মাদক কারবারি নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে বিজিবি উদ্ধার করে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, কার্তুজ ও কিরিচ। গত ২৪ জুলাই কক্সবাজারের রামু উপজেলার মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্ট নামক স্থানে বিজিবি অভিযান চালিয়ে যাত্রীবাহী সিএনজি তল্লাশি করে সাড়ে ৮ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারসহ আনোয়ার হোসেন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, এই আনোয়ার দুই পায়ের হাঁটুর নিচে ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে এবং কাঁঠালের ভেতরে অতিকৌশলে লুকিয়ে ওই ইয়াবার চালান বহন করছিল। গত ২০ জুলাই রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা ছুরিখালের মোচনী লবণ মাঠ বরাবর নাফ নদী দিয়ে সাঁতরে ইয়াবার একটি চালান মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পাচারকালে তিনজনকে চ্যালেঞ্জ করে বিজিবি। এক পর্যায়ে ৩৯ হাজার ৬৮০ পিস ইয়াবার চালান (ব্যাগে ভর্তি) ফেলে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দ্রæত পাশর্^বর্তী গ্রামের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যায় ইয়াবা বহনকারীরা। গত ১১ জুলাই টেকনাফের স্থলবন্দর সংলগ্ন ১৪নং ব্রিজের নিকটবর্তী কেয়ারিখাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এ সময় অভিযানকালে এক ইয়াবা কারবারি নিহত হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ। গত ৯ জুলাই ৩৪ বিজিবি তমব্রæ বিওপির সদস্যরা কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ৪নং রাজাপালং ইউনিয়নের তুলাতলি এলাকায় অভিযানে গেলে সেখানে রোহিঙ্গা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গুলি হয়। এতে তিন রোহিঙ্গা মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। এ সময় সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ৩ লাখ পিস ইয়াবা, দুটি পাইপগান ও ৫ রাউন্ড পাইপগানের কার্তুজ। গত ৫ জুলাই টেকনাফের হ্নীলার পাশর্^বর্তী অবরাং গ্রামের নানিরবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। স্থানীয় বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, ওই ইয়াবার চালানটি সাঁতরে বাংলাদেশে নাফ নদীর তীরে নিয়ে আসছিল। এ সময় বিজিবির টহল দল দেখে মাদক কারবারিরা গুলি চালায়। বিজিবিও পাল্টা গুলি চালালে সেখানে দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। এ সময় সেখান থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ একটি চায়না পিস্তল ও ২ রাউন্ড চায়না পিস্তলের তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১ জুলাই চট্টগ্রামে ১ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ মাহফুজ নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। গত ৪ জুলাই মানিকগঞ্জ থেকে ১ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ রোসল ও রায়হানউদ্দিন নামে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
এ ছাড়াও বিজিবি গত জুলাই মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৮০ পিস ইয়াবা, ৫৪ হাজার ৭৯৩ বোতল ফেনসিডিল, ৫ হাজার ৯৩১ বোতল বিদেশি মদ, ১ হাজার ৬১৪ ক্যান বিয়ার, ১ হাজার ২১৬ কেজি গাঁজা, ২ কেজি ৩৭০ গ্রাম হেরোইন, ১৫ হাজার ৭৭১টি উত্তেজক ইনজেকশন, ৭ হাজার ৫৬৭টি অ্যানেগ্রা-সেনেগ্রা ট্যাবলেট এবং ৮ লাখ ৯৪ হাজার ৭টি অন্যান্য ট্যাবলেট উদ্ধার করে।

ট্যাগ :

আরও পড়ুন


Logo