ফেনী
বুধবার, ২০শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৬:৪৪
, ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

অভিযোগ বাদীর

ডিবির স্বর্ণ লুটের ঘটনায় এজাহার বদলে দিয়েছে পুলিশ

ফেনীতে স্বর্ণ লুটের ঘটনায় করা এজাহারের মূল বক্তব্য পুলিশ পাল্টে দিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মামলার বাদী গোপাল কান্তি দাশ। তিনি জানান, এজাহার হিসেবে দুটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। কিš‘ ওই এজাহারের বক্তব্য তাকে পড়তে দেওয়া হয়নি। আর উদ্ধার হওয়া স্বর্ণগুলোর বেশিরভাগই অন্য কারও বলে তিনি বারবার জানিয়েছেন। এরপরও পুলিশ তার কথায় কর্ণপাত করেনি। এ কারণে এসব স্বর্ণের সঙ্গে তার স্বর্ণের কাগজপত্রের গরমিল দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ী গোপাল। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

এদিকে এজাহার পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ শুনে বাদীকে আবারও ‘মূল অভিযোগ’ লিখে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে বলেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ লুটের অভিযোগের পর আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে আমরা কতটা আন্তরিক ছিলাম, তা সবাই জানে। ওই সময় গোপালকে দিয়ে মামলা করাতেই পারিনি। এক পর্যায়ে বলেছি, আপনাকে মামলা করতেই হবে। এখন আবার বলছেন, ‘আমার অভিযোগ নেয় নাই।’ আমি বলেছি, আপনার মূল বক্তব্যটা আবার লিখে বর্তমানে তদন্ত করছে পিবিআই, ওই পিবিআই কর্মকর্তার কাছে গিয়ে দিয়ে আসেন। সেটাই করা হবে।’

গোপাল কান্তি দাশ শুক্রবার মোবাইল ফোনে বলেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে প্রথমে মামলা করতেও সাহস করিনি। চট্টগ্রামের ডিআইজি আশ্বস্ত করায় মূলত সাহস পাই। কিš‘ এখন মনে হচ্ছে পুলিশ নিজেদের লোকদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কারণ আমার মূল অভিযোগগুলো এজাহারের বক্তব্যে উল্লেখ নেই। পুলিশ নিজের মতো করে এজাহার তৈরি করেছে। যেদিন মামলা করা হয়েছিল, সেদিন ফেনী মডেল থানায় অন্তত পাঁচ থেকে সাতবার এজাহারের কপি প্রিন্ট করা হয়।

বারবার পড়ে তা একাধিকবার ছিঁড়েও ফেলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এক পর্যায়ে ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন দুটি এজাহারের কাগজে আমার স্বাক্ষর নেন। আমি পড়ে স্বাক্ষর করতে চাইলে ধমক দিয়ে দ্রæত স্বাক্ষর করতে বলেন। এ ছাড়া স্বর্ণ উদ্ধার অভিযানকালে আমি সেখানে ছিলাম না। কিন্তু এজাহারে আমার উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া ১৫টি স্বর্ণ বারের মধ্যে মাত্র পাঁচটি আমার বলে জানিয়েছি; কিš‘ পুলিশ তাতে গুরুত্ব দেয়নি। উল্টো ১৫টি স্বর্ণের বার আমার বলে উল্লেখ করেছে। ওই সময় আমাকে মামলার এজাহারের একটি কপিও দেওয়া হয়নি। কয়েকদিন পর পুলিশ হোয়াটসঅ্যাপে আমার স্বাক্ষর করা একটি এজাহারের কপি পাঠালে দেখি তাতেই প্রায় সবকিছু উল্টো। বিষয়টি নিয়ে আমার আইনজীবীসহ ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বললে তারাও সব শুনে বলেছেনম এটা পুলিশ ই”ছাকৃত বা পরিকল্পিতভাবে করেছে। নিজেদের লোকদের বাঁচাতে এজাহার পাল্টে দিয়ে থাকতে পারে।’

এজাহার পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন বলেন, ‘বাদী গোপাল কান্তি যা অভিযোগ দিয়েছেন সে অনুসারেই মামলা হয়েছে। নিজেই এজাহারে স্বাক্ষর করেছেন। ওই সময় পুলিশের অনেক সিনিয়র অফিসারও উপস্থিত ছিলেন। মামলা রেকর্ডের পর আমি তদন্তের দায়িত্ব পাই। ফলে এজাহার পাল্টানোর প্রশ্নই আসে না।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) খন্দকার নুরুন্নবী বলেন, ‘বাদী যা বলেছেন, এজাহারে তাই উল্লেখ করা হয়েছে। গোপালের তথ্য মতে, আসামি শনাক্ত বা গ্রেফতারসহ সব কাজ হয়েছে। এখন মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। বাকি বিষয়ে পিবিআই বলতে পারবে।’

এ প্রসঙ্গে পিবিআইর ফেনী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এজাহার পাল্টে দেওয়ার কোনো অভিযোগ বাদী আমার কাছে করেননি। মামলার তদন্তের স্বার্থে বাদীকে কয়েকবার ডাকা হয়েছে। এর মধ্যে বাদীর গাড়িচালকের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও শেষ হয়েছে। এ ছাড়া গাড়িটিও মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।’ তবে এজাহার পাল্টানো সংক্রান্ত কোনো বিষয় থাকলে তা আদালতের মাধ্যমে সংশোধন করাতে হবে বলেও তিনি জানান।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী এজাহার লেখার নিয়ম। এজাহারের বক্তব্যে গরমিল থাকলে আসামিপক্ষের সুযোগ নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে তদন্ত ঠিকমতো হলে সে সুযোগ নিতে পারে না আসামিরা। মামলার ক্ষেত্রে এজাহারে মূল ঘটনা উল্লেখ থাকা ও সময়মতো এজাহার দায়ের করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মূলত তদন্তের পর আদালতে দাখিল করা চার্জশিটই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এজাহারের বক্তব্যে গরমিল দেখলে তা সংশোধন করার সুযোগ আছে। বাদী সংশোধিত অংশটুকু লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে।

উল্লেখ্য, গত ৮ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের হাজারী গলির স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল কান্তি দাশ ২০টি সোনার বার নিয়ে ঢাকা আসছিলেন। ওইদিন সন্ধ্যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফেনী সদর উপজেলার ফতেহপুর রেলওয়ে ওভারপাস এলাকায় ডিবি পুলিশ তার গাড়ি থামায়। এরপর তাকে আটক করে দূরবর্তী ¯’ানে গিয়ে সোনার বারগুলো ছিনিয়ে নিয়ে ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দেয়। এ ঘটনার পর দিন ওই ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। অভিযোগ পেয়ে ফেনী জেলা পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ১০ আগস্ট রাতে জেলা ডিবি পুলিশের ওই ছয় কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে জেলা পুলিশ। রিমান্ড শেষে বর্তমানে এই ছয় পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারে আছেন। তারা হলেন- ফেনী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম, উপপরিদর্শক (এসআই) মোতাহার হোসেন, নুরুল হক ও মিজানুর রহমান এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) অভিজিৎ বড়ুয়া ও মাসুদ রানা। এরপরই তাদের হেফাজত থেকে ১৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে পুলিশ। যেগুলো ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী গোপালের বলে জানায় পুলিশ। যদিও গতকাল গোপাল বলেছেন, ডিবির ওই চক্র তার কাছ থেকে মোট ২০টি স্বর্ণের বার ছিনিয়ে নেয়, যার মোট ওজন ২০০ ভরি। উদ্ধার হওয়া ওই ১৫টি স্বর্ণের বারের মধ্যে মাত্র পাঁচটি গোপালের। এই পাঁচটি স্বর্ণের বারের ওজন ৫০ ভরি। সেগুলোর কাগজপত্র বা ট্যাক্সের কপিও তার কাছে রয়েছে। উদ্ধার করা বাকি ১০টি স্বর্ণের বার অন্য কারও হতে পারে। সে হিসেবে ডিবির ওই চক্র এসব স্বর্ণ অন্যদেরও একইভাবে অপহরণ করে ছিনিয়ে নিয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন এই স্বর্ণ ব্যবসায়ী।

ট্যাগ :

আরও পড়ুন


Logo